ডিস্ট্র্যাকশন বেশি? কাজ করতে বোরিং লাগে? “ভাল-লাগেনা যত্তসব” টাইপের মনোভাব? কিন্তু দিনশেষে অনেক কাজ বাকি, শেষ না করলেই নয়। তবে হয়তোবা, পমোডরো টেকনিক তোমার সমস্যা দূর করে দিতে পারে, তাও চিরকালের জন্যে (অনেকটা এমনই বলা যায়)।

কাম অন, মিথ্যা বলার প্রয়োজন নেই। ফেসবুক, ইউটিউবের জন্যে আমরা সবাই “কাল করবো সিউর” থিওরিতে বিশ্বাসী। এই বিশ্বাসীদের মধ্যে আমি যে টপ ১০০-তে জায়গা পাবো, এটাতে কোন সন্দেহ নেই।

এমন কি এই আর্টিকেলটা লিখতে বসেও কতোবার উঠবো তার সংখ্যা অজানা। আমি ধরে নিচ্ছি আমার আশে-পাশের মানুষেরাও আমার মতোই এই রোগের ভুক্তভোগী। যদিও প্রোক্রাস্টিনেশনের ব্যাপারটা অনেকটা সাইকোলজি(মনোবিজ্ঞান)-এর সাথে সম্পর্কিত। তবে ইন্সট্যান্ট সলুশন কি?

এসবের মধ্যেই আসে, পমোডরো টেকনিক। পমোডরো টেকটিক একটি সিম্পল টেকনিক যা অনেক বড় ধরনের চ্যাঞ্জ আনতে পারে দৈনিক জীবনে। ব্যস্ত মানুষদের জন্যে অনেক সহজ এবং কাজের একটি পদ্ধতি এটি। তাহলে চলো দেখি এটা তোমার জীবনে কিভাবে কাজে লাগাতে পারো।

পমোডরো টেকনিক কি?

৯০এর দশকে, ফ্রান্সেসকো চিরিলো, একজন ডেভেলপার ও অন্ট্রপ্রেনেওর, পমোডরো টেকনিকটি আবিষ্কার করেন। ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি নিজের কাজগুলো করার জন্যে এই প্রসেসটা ফলো করতেন। যখন কোনো বড় কাজ করতে হতো, তিনি এগুলোকে আগে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিতেন এরপর একটি নির্দিষ্ট সময়ের(সাধারণত ২৫ মিনিট) মধ্যে কাজের একটু একটু শেষ করতেন। নিজের ব্রেনকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে একটি কাজে ফোকাস করে নিজের মনযোগীতাকে আরো দৃঢ় করে নিজের প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতেন তিনি।

পমোডরো টেকনিকে মূলত প্রতিবার একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে কাজ করা হয় যাকে ‘পমোডরোস’ বলে এবং প্রতি দুটি পমোডরোসের মাঝে অল্পসময়ের জন্যে ব্রেক নিয়ে আবার আরেকটি পমোডরো শুরু করতে হয়। এভাবে প্রতি ৪টি পমোডরোসের পরে একটি লম্বা সময়ের জন্যে ব্রেক নেওয়া হয়। যার পরে আবার আরেকটি পমোডরো শুরু করা হয়।

পমোডরো টেকনিক কিভাবে কাজ করে?

পমোডরো টেকনিক অত্যন্ত সহজ একটি টেকনিক। ৫ স্টেপে তুমি আজকে থেকেই পমোডরো টেকনিক ফলো করতে পারবে।

১. প্রথমেই কি কাজ করতে চাও তা নির্ধারণ করো। ‘পরে করবো’ বলে ফেলে রাখলে এই টেকনিক নিয়ে আর সামনে এগিয়ে লাভ নেই। কারণ, এই মনোভাব থাকলে হাজার টেকনিক ফলো করলেও দিনশেষে লাভ হবে না। তাই প্রথমেই কি কাজ করবে তার একটি লিস্ট তৈরি করে নাও। এরপর কোনটাতে কত সময় লাগতে পারে তা অনুমান করে লিখে রাখো।

২. ডিস্ট্র্যাকশনের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া এবং এন্টারটেনমেন্ট হচ্ছে সবচেয়ে মারাত্মক দুটি। এগুলো শুধু মূল্যবান সময়ই নষ্ট করে না, সাথে সাথে শেখার এবং জানার আগ্রহকে কমিয়ে তোলে। তাই যদি প্রয়োজন না থাকে ড্যাটা অফ করে মোবাইলটাকে পাশে রেখে দাও৷ প্রয়োজনে আশে পাশের থেকে ডিজিটাল ডিভাইস সরিয়ে নাও। মনোযোগ একবার হারালে, কাজের মধ্যে আবার ফোকাস করতে ২০-২৫ মিনিট সময় লাগতে পারে।

৩. কাজ নির্বাচন করে এবং আশেপাশের থেকে ডিস্ট্র্যাকশনের মাত্রা কমিয়ে, এবার ঘড়িতে কাউন্টডাউন টাইমার ২৫ মিনিটের জন্যে সেট করে কাজ শুরু করে দাও। তুমি চাইলে নিজের মতো করে সময়টা বদলাতে পারো। কাজের ধরণ অনুযায়ী সময় পরিবর্তন করাটা স্বাভাবিক।

৪. ২৫ মিনিট কাজ বা একটি পমোডরোসের পর ৫ মিনিটের জন্যে ছোট্ট একটা বিরতি নিতে পারো। বিরতি নেওয়াটাও প্রয়োজনী। এই স্টেপটাকে বাদ দিয়ে গেলে চলবে না। অন্যথায়, একটানা অনেকক্ষণ কাজ করার কারণে একঘেয়ে লাগতে পারে। সহজেই ক্লান্তি চলে আসলে কাজ সম্পূর্ণ করাটা কঠিন হয়ে উঠবে।

এসময়টাতে ডেস্ক থেকে উঠে একটু ফ্রেশ হয়ে আসতে পারো

৫. প্রতি ৪টা পমোডরোসের(২৫ মিনিট কাজের) পর একটু লম্বা সময়ের বিরতি নাও। কয়েকটি পমোডরোসের পরে ১৫-২০ মিনিটের বিরতি নাও। ক্লান্ত হওয়াটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। ক্লান্তিকে কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। লম্বা সময়ের জন্যে কাজ করার পরও ক্লান্তি আসাটা স্বাভাবিক।

তাই, যতক্ষণ আবার কাজ করার মন তৈরি না হয় ততক্ষণের জন্যে বিরতি নিতে পারো। এই বিরতির সময় যেনো ৩০ মিনিটের উপরে কোনো ক্ষেত্রেই না হয় তা খেয়াল রেখো। আবার কম সময়ের জন্যেও বিরতি নিয়ো না। এতে রিচার্জ হওয়ার আগেই তুমি ডাউন হয়ে যাবে। অর্থাৎ, তাড়াতাড়ি ক্লান্তি চলে আসবে এবং কাজ করতে মন চাইবে না বেশিক্ষণ।

পমোডরো টেকনিক ডিস্ট্র্যাকশন কমায় না বরং তুমি নিজের ডিস্ট্র্যাকশনগুলোকে কিভাবে ম্যানেজ করে নিতে পারো তা শেখায়। ডিস্ট্র্যাকশনের পরিমান সবসময় একই থাকে।

আসেপাশের মানুষদের দ্বারা ডিস্টার্বড হওয়াটাও একটি চিন্তার বিষয়। সেটা বন্ধু হোক কিংবা পরিবারের কেউ। অথবা হোক অফিসের কলিগ, কাজের মধ্যে একবার ডিস্টার্ব করলেই পরে আবার কাজে মন বসাতে অনেক সময় লেগে যাবে। তাই, এই ধরনের ডিস্ট্র্যাকশন দূর করার জন্যে ফ্রান্সেসকো ৪ টি কাজ করার জন্যে বলেছেন।

  • যে ডিস্টার্ব করছে তাকে জানিয়ে দাও তুমি গুরুত্বপূর্ন কোনো কাজ করছো। বেশিরভাগ মানুষেরই বোঝার কথা যে কেউ কাজ করলে পরে ফ্রি হলে নিজের কাজ সারাতে হবে। তবে, যদি সহজেই রাগ হওয়া বস কিংবা পরিবারের বড় ডিস্টার্ব করে, তাহলে তাদের বোঝানোটা কঠিন হবে। তবে চেষ্টা করে দেখতে সমস্যা কই, একবার নম্রভাবে বলেই দেখো।
  • জানানোর পরে তুমি তাদের কাছ থেকে সময় নিয়ে নাও। তারপর তোমার ৫ মিনিটের পমোডরোসের বিরতিতে অথবা ৪টা পমোডরোসের পরের লম্বা বিরতির সময়টা তাদের জানিয়ে দাও।
  • তাদের কয়েকটা সময়ের চয়েস দিয়ে তাদের থেকে একটি সময় কনফার্ম করো যখন তোমরা কন্ট্যাক্ট করতে পারবে।
  • আর সর্বশেষে যে সময় নির্ধারণ করেছ তাদের সাথে, তখন তাদের সাথে কন্ট্যাক্ট করো।

মনে রাখবে, এখানে সবকিছু সময়ের উপর নির্ধারণ করে করা হচ্ছে। সফল মানুষেরাও এভাবেই নিজের জীবন গুছিয়ে নেয়। প্রয়োজনে পারসোনাল এসিস্ট্যান্ট রাখে। তারপরেও তারা যখন তখন যে কাউকে নিজেকে ডিস্ট্যার্ব করতে দেয় না।

অবশ্যই কিছু অবস্থা থাকে যখন সাথে সাথেই কিছু করার প্রয়োজন হয়, কিংবা কিছু মানুষ যাদের এড়িয়ে চলা যায় না। তখন, অবশ্যই তোমাকে রেসপন্স দিতে হবে। প্রয়োজনে পমোডরো বন্ধ করে দাও, তাদের সাথে কাজ শেষ করে তারপরেই আবার আগের পমোডরো থেকে চালিয়ে যাও।

একই শর্ত বন্ধুদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য৷ কিছু বন্ধুকে এড়িয়ে চলা যায় না৷ কিন্তু যদি বেশিরভাগ বন্ধুই তোমার সাথে রাগ করে, ঠাট্টা করে, তবে হয়তোবা তুমি বন্ধু নির্বাচনে ভুল করেছ। এমন বন্ধু জীবনে তোমাকে কোথায় নিয়ে যাবে, যারা তোমার সময়ের গুরুত্ব বোঝেনা। তোমার সময়ের গুরুত্ব না বোঝা বন্ধুগুলোগুলো নিজের সময়ের গুরুত্ব দেয়তো?

যাইহোক, এভাবে নিজের সময়ের নিয়ন্ত্রণ নিজের মধ্যেই রাখার চেষ্টা করো। অন্য কাউকে এই সময় অপচয় করতে দিও না।

পমোডরো টেকনিক ব্যবহার করলে আমার জীবনে কি পরিবর্তন আসতে পারে?

পমোডরো টেকনিক ভালোভাবে ফলো করতে পারলে অনেক সুবিধা হতে পারে। মনোযোগীতা দৃঢ় হওয়া থেকে অযথা সময় নষ্ট পর্যন্ত অনেক কিছুতে পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিশেষকরে,

নিজের প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি হয়।
কাজের মধ্যে মনোযোগী হওয়া সহজ হয়।
কাজের মান এবং পরিমাণ বৃদ্ধি হয়।
টাইম ম্যানেজমেন্ট উন্নত হয়।
কাজের মধ্যে ফোকাস করা সম্ভব হয় যার ফলে প্রোক্রাস্টিনেশনের মাত্রা কমে যায়।
প্রতিদিনের কাজ সময়মতো সম্পন্ন করাটা সহজ হয়ে যায়।

তুমি কিভাবে পমোডরো টেকনিক নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারো?

প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধির জন্যে সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হচ্ছে এটি। এই টেকনিক ফলো করাটা “একটা কাজের লিস্ট তৈরি করা” থেকেও সহজ।

পারসোনালি আমি বলবো নিজের লাইফস্টাইল অনুযায়ী টেকনিকটা মডিফাই করে নিতে। উদাহরণ স্বরূপ, শিক্ষার্থী হলে পড়ার সময় ২৫ মিনিট কিংবা ২০ মিনিট পড়ে, পরের ৫ মিনিট আগের পড়াটা রিভিও করে এরপর ৫ মিনিটের বিরতি নিতে পারো।

যেহেতু, প্রতিদিন আর্টিকেল লিখি, আমি নিজেও কিছু পরিবর্তন করেছি। তুমিও নিজের লাইফস্টাইল অনুযায়ী কিছু পরিবর্তন করে নিতে পারো। সবাই হয়তোবা এই টেকনিক নিজের জীবনে ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে না। ছাত্রদের জন্যে পড়ালেখার সময় ফোকাস ধরে রাখতে এটি একটি সত্যিই কাজের পদ্ধতি। যারা ক্রিয়েটিভ কাজ করে কিছু তৈরি করে, যেমন ওয়েব ডিজাইনার থেকে শুরু করে বইয়ের লেখক সবাই এই পদ্ধতি ফলো করে কাজ করতে পারে। অনেক মানুষ ইতিমধ্যেই এটি ব্যবহার করে প্রতিদিনের কাজ করছে।

এতে কাজের মান উন্নয়ন হওয়ার সাথে সাথে নিজের টাইম ম্যানেজমেন্টেরও উন্নতি ঘটবে। সবচেয়ে ভালো হবে, তুমি আগে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখো তোমার জীবনে এটা পরিবর্তন আনতে পারে কি না। আবারও বলি, সবার জন্যে একটা টেকনিক কাজ করার কথা নয় আর কার সাথে করবে তা জানার জন্যে নিজে চেষ্টা করাটাই উৎকৃষ্ট উপায়।

অনেকের মনেই ভাবনা আসে প্রতিদিন এভাবে কাজ করাটা কষ্টের হতে পারে যেহেতু অলসতা কম-বেশি সবার মধ্যেই আছে। তবে সবসময় এভাবে কাজ করতে হয় না৷ সময়ের সাথে সাথে ব্রেনেরও ট্রেইনিং হয়ে যায়৷

একসময় ঘড়ি ধরেও কাজ করতে হয় না৷ কিছুক্ষণ কাজের পরে অটোমেটিক একটু উঠে গিয়ে স্ট্রেচিং করতে মন চায়। অনেকটা দৈনন্দিন জীবনের সাথে মিশে যায়। একইভাবে সকালে উঠতে সারা বছর এলার্ম লাগে না।

যাইহোক, এতোটুকু পড়েছ যেহেতু অনেক কিছুই জানতে পেরেছ। এখন নিজে এ পদ্ধতিটা ফলো করেই দেখ, যদি নিজেকে একটু বেশি প্রোডাক্টিভ মনে হয় তবে বড় যেকোনো কাজ সামনে পড়লেই এপদ্ধতি ব্যবহার করতে পারো।

Got Something to Say?

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.