মিথ: ডিম খেলে কোলোস্টেরল বাড়ে/হার্টের বিভিন্ন রোগ হয়

ফ্যাক্ট : ওকে, সত্য কিন্তু পুরো সত্য নয়৷ কনফিউজিং নাহ? আচ্ছা দাড়াও, বুঝাচ্ছি।

ডিমের মধ্যে কোলেস্টেরল থাকে। অনেক বেশি পরিমাণেই থাকে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের বোঝা উচিত কোলেস্টেরল কি।

কোলেস্টেরল দেহের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এটি লিভারে তৈরি হয় এবং বিভিন্ন হরমোন তৈরির জন্যে দায়ী (হরমোন কি? এটা আবার দেহের কেনো লাগে? ধরে নাও, দেহের বিভিন্ন কাজের জন্যে প্রয়োজন হয়)৷ কিন্তু একই সাথে অনেক বেশি কোলেস্টেরল ক্ষতির কারণ হতে পারে।

কোলেস্টেরল, অনেকটা তেলের মতো, পানির সাথে মিশতে পারে না। যার জন্যে ‘লিপোপ্রোটিন’ নামক উপাদান, দেহের অন্যান্য অংশ থেকে লিভারে একে লিভারে নিয়ে জন্যে। এই লিপোপ্রোটিন কয়েকধরনের হয়, যার মধ্যে হাই-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন – এইচডিএল) এবং হাই-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (নিম্ন ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন – এলডিএল) প্রধানগুলোর দু’টি।

এ দু’টির মধ্যে এলডিএল হচ্ছে শরীরের জন্যে খারাপ কারণ এটির অনেকগুলো একসাথে মিলে রক্তের মধ্যে জমাট বেধে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে যা পরে রক্ত চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। রক্ত চলাচলের এই সমস্যা হার্টের রোগের কারণ হতে পারে। আবার অন্যদিকে এইচডিএল দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে কোলেস্টেরল লিভারে নিয়ে যায়, যাতে করে এধরনের সমস্যার সৃষ্টি না হয়।

কোলেস্টেরল কিভাবে কাজ করে তার উপর একটু ব্যাসিক ধারণা পেয়ে গেছো। তাহলে তুমি এখন বুঝতে পারবে যে কোলেস্টেরেলের পুরোটাই দেহের জন্যে ক্ষতিকর নয়। আর দিনে ১-২টা ডিম রক্তে এতোটা প্রভাবিত করবেনা যতোটা ফাস্ট ফুডের ট্রান্স ফ্যাট এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট করবে।

আর ডিমে যে শুধু কোলেস্টেরল আছে তা নয় এতে ভিটামিন ১২, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি সহ ৯টি গুরুত্বপূর্ণ এমাইনো এসিড আছে- সব মিলে এটি একটি সুপারফুড। তাই স্বাস্থ্য ভালো রাখার অন্যান্য প্র্যাকটিস গুলো মেনে চললে ডিম এতোটা সমস্যা করবে না। তবে, ডায়াবেটিস এবং হার্ট রোগীদের জন্যে এটা কম পরিমাণেও অনেক ক্ষতিকর হতে পারে। মোটা/অলস মানুষ যদি প্রয়োজনের অতীত গ্রহণ করে, তবে তাদের উল্লেখিত রোগ হওয়ার বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

মিথ: চিনি বেশি খেলে ডায়াবেটিস হয়

আখের থেকে তৈরি চিনি

ফ্যাক্ট : চিনি বেশি খেলে ডায়াবেটিস হয় না, তবে যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের জন্যে চিনি বেশি খাওয়াটা ক্ষতিকারক।

চিনি বলতে শুধু দৈনন্দিন খাবারে দেওয়া চিনিটাকে (টেবিল সুগার) বোঝানো হচ্ছে না, বরং এগুলোর সাথে মিষ্টিজাতীয় খাবারে থাকা চিনিটাকেও(গ্রুকোজ, স্যাক্রোজ বোঝানো হচ্ছে। তাই, চিনি বললে শুধু কোম্পানির তৈরি প্যাকেটের চিনি বোঝার কোনো কারণ নেই।

মূল কথায় আসি এইবার, এই বিভিন্ন খাবারে থাকা চিনিকে আমাদের দেহ কাজে লাগাতে পারে না৷ এজন্যে এই চিনিকে গ্লুকোজে রূপান্তর করে নেয়৷ গ্লুকোজে রূপান্তরের জন্যে, অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন এসে চিনির সাথে মিলিত হয়। যদি অগ্ন্যাশয়ে কোনো কারণে ইনসুলিন তৈরি না হয় কিংবা ইনসুলিন তৈরি হলেও কোনো কারণে সেটা চিনিকে গ্লুকোজে রূপান্তর করতে না পারে, তখন রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যায়, আর এই অবস্থাকে ডায়াবেটিস বলে। অনেকে এটাকে রোগও বলে।

যদি প্রসেসটা বুঝে থাকে তাহলে বুঝবে যে চিনি কতটুকু খাওয়া হলো তার উপর ডায়াবেটিস হওয়াটা নির্ভর করে না বরং ইনসুলিন সেটাকে গ্লুকোজে রূপান্তর করতে পারে কিনা, তার উপর নির্ভর করে।

মিথ: সুস্থ থাকতে হলে প্রতিদিন ৮ গ্লাস পানি খাওয়া প্রয়োজন

Glass of Water

ফ্যাক্ট: এটা একটা বহুল পরিচিত উপদেশ (যা অবশ্যই সত্য নয়)। অনেক বড় বড় মিডিয়াও কয়েক বছর আগে এটাকে প্রচার করেছে। বাংলাদেশের একাডেমিক বইয়ের মধ্যেও এই পরামর্শকে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু এটাও একটা কুসংস্কার। একটা ছোট্ট ভুল ধারণা থেকে এটার উৎপত্তি।
৮ গ্লাস পানি পান করার পরামর্শের উৎস হচ্ছে ফুড এন্ড নিউট্রিশন বোর্ড, যা বর্তমানে ন্যাশনাল একাডেমি অব মেডিসিন (এনএএম) এর অংশ।

তারা উপদেশ দিয়েছিল যত ক্যালোরি খাবার খাওয়া হয়, ততো মিলিলিটার পানি পান করার জন্যে৷ অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন একজন সুস্থ্য-সবল পুরুষ ১৯০০ ক্যালরি খাবার খায় বলে ১৯০০ মিলিলিটার (=৬৪ আউন্স=প্রায় ৮ গ্রাস) পানি পান করার কথা ছিলো।
মানুষ এটাকে ধরে নিয়েছিলো ৮ গ্লাস পিউর পানি পান করতে হবে। তখন তারা হয়তো চিন্তাই করেনাই যে আমরা প্রিদিন যে খাবার খাই বা অন্যান্য পানিও পান করি তাতেও পানি থাকে। এমনকি বাদামেও পানি থাকে।

মিথ: খাবারে ক্যামিকেল থাকলেই সেটা খারাপ

ফ্যাক্ট: এইটা আমার একটা ফেভারেট মিথ৷ ড্যাম সিরিয়াসলি? আর কিছু না পেয়ে এখন সব ক্যামিকেলের দোষ? এজন্যে মাঝে মাঝে ভাবি যদি ফেসবুক, ইউটিউব কয়েকশ বছর আগে তৈরি হতো, আজাইরা মানুষগুলো এইসব ছড়ানোর সময় পেতো না (অবশ্য চান্স আছে এমন সব আরো তাড়তাড়ি এবং বেশি বেশি ছড়াতো, ভালোই হয়েছে তৈরি হয়নি বছর ‘শ আগে)।

যাইহোক, কাজের কথা আসি। আজ হয়তোবা একটা বড় মিসকনসেপশন থেকে মুক্ত হবে তুমি। তুমি তৈরি তো?

সব কিছুতেই ক্যামিকেল থাকে।

আরো ক্লিয়ার করে বললে, সব কিছুই ক্যামিকেল।

কমপক্ষে আমরা যারা সিক্স-সেভেন পর্যন্ত হলেও পড়েছি তারা জানি যে সব কিছুই ক্যামিকেল। এমন কি পানিও। H2O! ওপস, কিছু অতিরিক্ত সতর্ক মানুষ এখন থেকে পানিও পান করবে নাহ 😉

এখন ব্যাপার হচ্ছে যদিও আমি বুঝতে পারছি যে কথা বলার সময় ক্যামিকেল বলতে এমন ক্যামিকেল যেগুলো শরীরের জন্যে খারাপ সেগুলোর কথা বলা হয়। কিন্তু সেটা তুমি আমি বুঝি আমজনতা কি বুঝে! সেটা বাদ দাও আমরা যারা বুঝি তাদের মধ্যেই কয়জন জানি কোনগুলো শরীরের জন্যে খারাপ আর কোনগুলো তেমন ক্ষতিকর নয়।

তাই, ক্যামিকেল থাকলেই যে কোনো খাবার ক্ষতিকর তা নয়, উল্টো দেহের জন্যে ক্ষতিকর যা, তা অল্প পরিমাণে থাকলেও সেটা ক্ষতিকর।

মিথ: তরকারিতে দেওয়া তেল শরীরের এতো ক্ষতি করবে না

ফ্যাক্ট: হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা

সরি, একটু হাসি এসে গেছে। সত্য, একটুই এসেছে। এটা অস্বীকার করার কিছুই নেই যে সব তরকারিতে আমরা তেল দেই। হয়তোবা জীবনে লম্বা সময় ধরে এটা করতে করতে, এখন হয়তোবা অনেকে এটা ধরেই নিয়েছে যে তেল ছাড়া তরকারি রান্না করা সম্ভব নয়।

খাবার আমরা যতোটা ভালোই খাই না কেনো, সেটা সবজি হোক কিংবা মাংস, তেল দিতে আমরা পিছুপা হই না। এখানে আর গভীরে যাচ্ছি না, শুধু মনে রেখো বাংলাদেশে ৮৪ লক্ষেরও বেশি মানুষের ডায়াবেটিস আছে। প্রতি ১১ জন পূর্ণবয়স্কের মধ্যে ১ জনের ডায়াবেটিস রয়েছে।

আমরা সবাই জানি ডায়াবেটিস কতটুকু মারাত্মক রোগ। আর ডায়াবেটিস হওয়ার সাথে মোটাত্ব এবং অতিরিক্ত তেল জাতীয় খাদ্য বেশি খাওয়াটা সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। তাই, কমপক্ষে হলেও ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে তেল জাতীয় খাবার অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকো। আজ থেকে তাই ভাজাপোড়া কম হবে। তাই না?

তবে খাদ্য হতে তেল একেবারেই বাদ দেওয়াটাও ভুল। আমাদের শরীরের জন্যে এটা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। তবে, যতোটুক প্রয়োজন ত পরিমাণে অনেক কম। একজনের জন্যে প্রতিদিন ২০ গ্রাম পর্যন্ত তেল তেমন ক্ষতিকর নয়। আর ২০ গ্রাম মাত্র ৪ চামচ। সকালে ডীমের সাথেই এক চামচ দিতে হয় 😐

Got Something to Say?

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.