Mythbusting-Diabetes

ইদানীং ডায়াবেটিস নিয়ে দেশে অনেক কথা হচ্ছে। আর এটা সবারই জানা কথা চায়না, ইন্ডিয়া, বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। ডায়াবেটিস প্রতিকার করা তুলনামূলকভাবে অনেকটা কঠিনই।

তাই ডায়াবেটিস হওয়ার আগেই সাবিধান হওয়া উচিত। কথায় আছে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো। কিন্তু ডায়াবেটিস প্রতিরোধ নিয়ে ভাবার আগে, ডায়াবেটিস নিয়ে আমাদের মধ্যে যে কুসংস্কারগুলো আছে সেগুলো থেকে আগে প্রতিকার পেতে হবে।

কুসংস্কারে বিশ্বাস করে রোগ থেকে বাচার যতোই চেষ্টা করা হোক, দেখা যাবে ঘুরে ফিরে একটা জায়গাতেই আসতে হচ্ছে। তাই, আজকে ডায়াবেটিস নিয়ে কিছু কুসংস্কার দূর করার উদ্দেশ্যে এ আর্টিকেলটি লিখছি।

মিথ: বেশি পরিমাণে চিনি খেলে ডায়াবেটিস হয়।

আখের থেকে তৈরি চিনি
আখের থেকে তৈরি চিনি

ফ্যাক্ট: অনেক কারণে ডায়াবেটিস হতে পারে। যেমন:

  • জেনেটিক্স(বাবা-মা বা দাদা/দাদী/নানা/নানীর থাকলে)
  • খাদ্যাভ্যাস(ব্যাসিক ধারণা ছাড়াই নিজের ইচ্ছেমতো খাওয়া)
  • ব্যায়াম (ডাম্বেল নিয়ে খেলাটাই শুধু ব্যায়াম নয়, প্রতিদিন যে পরিমাণ হাটা হয় তাও ব্যায়ামের অন্তর্ভুক্ত। যারা প্রতিনিয়ত সাতার কাটে বা সাইকেল চালায় তাদের জন্যে প্লাস পয়েন্ট। বাইকারদের ….)
  • লাইফস্টাইল(প্রতিদিনের কাজ, দৌড়াদৌড়ি-ছোটাছুটি, অথবা ঘরে বসে টিভি দেখা সব কিছুরই ভূমিকা আছে৷ কিছু কাজ ডায়াবেটিসের হাত থকে রক্ষা করে আর কিছু কাজের জন্যে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়)

এলাইনা মেডিক্যাল ক্লিনিকের একজন ফ্যামিলি ডক্টর, মৌনাফ আলসামানের মতে, “হাই ক্যালরির খাবারের কারণে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হতে পারে।”

“টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগে, আপনার অগ্ন্যাশয় একেবারে কম ইনসুলিন তৈরি করে অথবা তৈরিই করে না৷ আবার এমনও হতে পারে কোষগুলো এই ইনসুলিন ভালো করে ব্যবহার করে না। যার কারণে রক্তের মধ্যে থেকে গ্লুকোজ/সুগার কোষে যেতে পারেনা যা শক্তির জন্যে প্রয়োজন।”

তাহলে কি করবা? ক্যালরি গুণে গুণে খাবার খাবা? মোটেই নাহ। তবে, হাই ক্যালরি আর লো ক্যালরির খাবার কোনগুলো এগুলো নিয়ে জেনারেল ধারণা রাখতে পারলে প্রতিনিয়ত ব্যালেন্স করে খেতে পারবে।

এই এতটুকু কাজ করে ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও প্রতিকার ছাড়াও আরো অনেক রোগের হাত থেকে বাচতে পারবে।

আলসামান তার রোগীদের বলেন যে চিনির কারণে ডায়াবেটিস হয়নাহ, তবে তার মানে এই না যে ইচ্ছেমতো চিনি খাওয়া যাবে। অবশ্যই চিনি কম খেতে হবে। তিনি আরও বলেন, “তোমাকে খেয়াল রাখতে হবে মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার পরেও যাতে ভালো ডায়েট আর ব্যায়াম তা বেক আপ দিয়ে দেয়।”

মিথ: শুধুমাত্র যাদের ওজন অতিরিক্ত বেশি তাদেরই টাইপ-২ ডায়াবেটিস হতে পারে।

বিভিন্ন সাইজের পুরুষ

ফ্যাক্ট: যেকেনো বয়স আর সাইজের মানুষেরই টাইপ-২ ডায়াবেটিস হতে পারে। বাচ্চাদেরও! বিশেষ করে যদি বাবা মায়ের এ রোগ থেকে থাকে।

যাদের ওজন বেশি তারা বেশি রিস্কে থাকে, তবে একই অবস্থা যাদের খাদ্যাভ্যাস ভালো নেই তাদেরও।

টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের বেশিরভাগেরই ওজন ঠিকই আছে অথবা একটু বেশি মোটা। অতিরিক্ত ওজন রিস্কি হতে পারে তাই বলে অতিরিক্ত ওজনের কারণেই হবে এমনটা নয়।

চিকন হলে রিস্ক একটু কম, তবে যদি অন্যান্য ফ্যাক্টর যেমন কম হাটাহাটি-নড়ানড়ি করা, খারাপ খাদ্যাভ্যাস, বাবা মায়ের কারো রোগটি থাকে তাহলেও রিস্ক থেকে যায়। কারণ যেকোনো ওজনের মানুষেরই হতে পারে।

মিথ: যদি পরিবারের কারো থেকে থাকে তাহলে আমার টাইপ-২ ডায়াবেটিস হবেই।

ফ্যাক্ট: ডায়াবেটিস হওয়ার ফ্যাক্টর গুলোর মধ্যে একটা জেনেটিক্স হলেও তার মানে এটা নয় যে পরিবারের থাকলেই হয়ে যাবে৷ কারণ, মনে রাখতে হবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস আর প্রতিনিয়ত ব্যায়াম ডায়াবেটিসকে হার মানায়।

সব রোগের মতোই ডায়াবেটিস প্রতিরোধেরও নিয়ম আছে। যদি পরিবারের কারো ডায়াবেটিস থেকে থাকে তবে কয়েকবছর পরপর পরীক্ষা করে মনিটর করা প্রয়োজন, বিশেষ করে ২০ বছরের পর থেকে।

যদি পরিবারের কারো ডায়াবেটিস থেকে থাকে তাহলে,

  • কয়েকবছর পরপর ব্লাড টেস্ট
  • প্রতিসপ্তাহে কমপক্ষে ২-৩ এক্সারসাইজ করা
  • পুষ্টি বিবেচনায় রেখে ভালো খাদ্যাভ্যাস

করতে পারলেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। শুনতে অনেক সহজ মনে হলেও, একটু আলসেমির জন্যেই দেশে আজ ৭১ লাখেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিস রোগী।

মিথ: ডায়াবেটিস থেকে বাচতে হলে অনেক কিছু করতে হবে আর রোগ সারানো তো অসম্ভবই।

ফ্যাক্ট: ব্যায়াম করার প্রথম দিনেই যদি ৫ কিলোমিটার হাটার, ১০ কেজির ডাম্বেল উঠানোর চিন্তা আসে, তবে এটাও মাথায় আসা স্বাভাবিক। সব কিছুর শুরু হয় ছোট একটা পদক্ষেপ থেকে।

এমন কি, আমার এক স্যারের কথা বলতে ইচ্ছে করছে। তখন উনার বয়স ৩৪ এর কাছাকাছি। উনি ডায়াবেটিস ধরা পড়ার এক-দেড় মাসের ভেতরই ডায়াবেটিস থেকে সেরে উঠেছেন। তেমন আহামরি কিছু করেন নাই৷ তিনি শুধু নিজের গাড়িতে চলা ফেরা বন্ধ করে দিছিলেন। ঐষুধের সাথে সাথে প্রতিদিন ৭-৮ কিলোমিটার এভাবে হাটার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এক প্রাইভেট থেকে অন্য প্রাইভেটে যাওয়ার জন্যে কখনো হাটতেন, কখনো জগিং করতেন। এতো ছোট একটা কাজ করেও তিনি এত মারাত্মক রোগের থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

হ্যা, হয়তো প্রতিদিন হাটতে কষ্ট হতো, তবে অসম্ভব ছিলোনা ব্যাপারটা৷ আর এর ফলাফল এতো মিষ্টি যে এতোটা কষ্ট করার আফসোস নেই, একেবারেই।

একইভাবে, প্রথম দিনেই একেবারে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে নাহলে সব চেষ্টা বৃথা, এমনটা ভাবা ভুল।

মুভিতে যেভাবে এক্সার সাইজ করে হিরো এমনভাবে করতে হবে বলে কোনো কথা নেই, বিশেষ করে ১ হাত এরপর ১ আঙুলে পুশ আপ। অথবা প্রফেশনাল এথলেটদের মতোও করতে হবে নাহ।

বাড়ির চার পাশ দিয়ে হাটা আর প্ল্যান ছাড়া অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকাটাই প্রথম স্টেপ।

মিথ: ডায়াবেটিস এতো একটা আহামরি কিছু না, আমি ম্যানেজ করে নিবো।

ফ্যাক্ট: একেবারে ১০ কিলোমিটার হাটার চিন্তা যেমন কিছু মানুষের আসে, কারো কারো মাথায়, টিভির সামনে থেকে নড়ে কিছু না করার চিন্তাও আসে।

মনে আছে সেই স্যারের কথা? তিনি কিন্তু প্রথম দিনেই সাত-আট কিলোমিটার হাটা শুরু করে নাই৷ তবে তিনি বসেও থাকেন নাই। প্রথম স্টেপটা অন্তত নিয়েছেন।

ডায়াবেটিসের কারণে হার্ট, কিডনিজনিত রোগ হতে পারে। এমনকি চোখে কম দেখা থেকে শুরু করে স্ট্রোকও হতে পারে। বিশেষ করে পায়ে ইনফেকশন হওয়াটা অনেক বড় ঝামেলার।

ডায়াবেটিস ম্যানেজ করা সম্ভব তবে এটি সিরিয়াস একটি রোগ। অবহেলা, ভবিষ্যতে বিপদের কারণ হয়ে যেতে পারে।

ব্লাড সুগার, ব্লাড প্রেসার, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকলে আর ধুমপান থেকে বেচে থাকলে রিস্ক অনেকটাই কম।

মিথ: ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে আমি আগেই জানতে পারবো। কোনো না কোনো লক্ষণ দেখা যাবেই।

ফ্যাক্ট: সত্য বলতে, অনেক মানুষেরই অতিরিক্ত পানি তৃষ্ণা পায়, ঘন ঘন প্রস্রাব করতে হয়, কাজ করার শক্তি নরমাল মানুষ থেকে অনেক কম, অকারণেই ওজন কমে বা কারো বৃদ্ধি পায়, কিন্তু দেশের ৫ ভাগের ৪ ভাগ মানুষই জানেনা তাদের ডায়াবেটিস আছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না বড় কিছু একটা হয়ে যায়। আর ততক্ষণ হতে হতে অনেক দেরি হয়ে যায়।

এজন্যেই কয়েক বছর পরপর ব্লাড সুগার আর প্রতিনিয়ত ব্লাড প্রেসার চেক করা প্রয়োজন।

মিথ: ফল-ফলাদি শরীরের জন্যে অনেক ভালো, আমি ইচ্ছেমতো খেলেও সমস্যা নেই।

বাটির মধ্যে ফল

ফ্যাক্ট: ফল অনেক পুষ্টিকর হলেও, কিছু কিছু ফল অনেক ক্যালরির হয়ে থাকে।

হাই ক্যালরি এবং হাই সুগার দুটাই ডায়াবেটিসের চিরশত্রু।

কলা, আঙুর, আম এসব হাই ক্যালরি/হাই সুগারজাতীয় ফল থেকে দূরত্ব বজায় রাখাই সর্বোত্তম।

অন্যদিকে, আনারস, কমলা, তরমুজ, নাশপাতি এগুলো মিডিয়াম ক্যালরির ফল। তবে, লো বা মিডিয়াম ক্যালরি ফল অতিরিক্ত খাওয়া যেই কথা, হাই ক্যালরির ফল খাওয়ায় একই কথা। তাই বেশি ক্যালরির ফলগুলো বেশি খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে যদি ডায়াবেটিস থেকে থাকে।

Got Something to Say?

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.